সত্যজিৎ না থাকলে ভিন্ন হতো বেড়ে ওঠা

শুভ বসু প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৩, ০৭:০৫ পিএম সত্যজিৎ না থাকলে ভিন্ন হতো বেড়ে ওঠা

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছোটবেলায় ছায়াছবির মধ্যে দিয়ে নয়, গোয়েন্দা কাহিনীর মধ্যে দিয়ে। বাদশাহী আংটি, সোনার কেল্লা, গ্যাংটকে গন্ডগোল, কৈলাশে কেলেঙ্কারি, বোম্বাইয়ের বোম্বেটে প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে। সেই সঙ্গে ছিল প্রফেসর শঙ্কু। অ্যাডভেঞ্চারের শখ ছিল কিন্তু ক্ষমতা ছিল না।  সত্যজিতের মধ্যে দিয়ে আমার সে স্বাদ পূর্ণ হতো। আমাদের পাঠভবনের ইংরেজির মাস্টারমশাই আরতি মাসি একটি চিঠি মিলিত সাহিত্য সভায় পড়েছিলেন, সত্যজিৎকে লেখা, শান্তিনিকেতনে ফেলুদাকে পাঠানোর অনুরোধ করে। উপলক্ষ ঘন্টা তলার ঘন্টা চুরি। আরতি মাসি আমাদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। প্রকৃত পক্ষে সত্যজিৎ না থাকলে আমাদের ছোটবেলাটা অন্যরকম হতো। দেশ আর আনন্দ মেলার পূজাবার্ষিকীতে ফেলুদা আর প্রফেসর শঙ্কু ছাপা হতো আর আমি অপেক্ষা করে থাকতাম কবে আসবে পূজাবার্ষিকী।
  
বড় হয়ে আঁতলামোর শখ হলো। উত্তরশিক্ষাতে উঠে ছায়াছবির সমাজে (সিনে সোসাইটি) যোগ দিলাম। ছায়াছবি আমি দেখতে ভালোবাসি, তার নির্মাণের কৌশল, তার ফটোগ্রাফি নয়, তার বক্তব্য যদি অনুভূতি  ছুঁয়ে যায় তাহলে আমার মনের পর্দায় সেই ছবির স্থান চিরকালই হয়। আমি ছবির বোদ্ধা নই কিন্তু নিয়মিত দর্শক। গুপী গাইন বাঘাবাইন আমার মন ছুঁয়ে গিয়েছিলো। ভূতের নৃত্য, সাহেব ভূত, দেশি ভূত তাদের বিভিন্ন নৃত্যকৌশল, যুদ্ধের রোধ মিষ্টির হাড়ি দিয়ে সবই কেমন যেন মনটাকে বেঁধে ফেলেছিল। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশে ভারতে আকালের যুগ পড়েছিল। গড়পড়তা ভারতীয়র আয়ু সে যুগে ছিল ১৮৮১-এর আদমশুমারি অনুযায়ী ২৪ বৎসর।  ইংরেজ শাসনের শাসনের শুরু হয়েছিল দুর্ভিক্ষ দিয়ে শেষ হয়েছিল দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিয়ে। পশ্চিমবাংলার সমাজের রাজনৈতিক রূপান্তর হয়েছিল ১৯৫৯ সালে এবং ১৯৬৬ সালে খাদ্য আন্দলোনের মধ্যে দিয়ে। পূর্বপাকিস্তানেও লেগে থাকতো খাদ্য সংকট। চল্লিশের শেষের দিকে এবং পঞ্চাশের গোড়ার দিকে প্রায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি হয়েছিল পূর্ব বাংলায়। পশ্চিমবাংলায় হয়েছিল খাদ্য আন্দোলন। ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধে হয়েছিল। উদ্ভিন্ন যৌবনে গুগা বাবা দেখে আমার মনে হয়েছিলো সত্যজিৎ যেন দুর্ভিক্ষ পীড়িত দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে  যুদ্ধের সমালোচনা করছেন। হীরক রাজার দেশে দেখে তো আমার নিশ্চিতভাবে মনে হয়েছিল জরুরি অবস্থার সমালোচনা। এই সহজ রাজনৌতিক সমীকরণ ওরম দুটি ছবির হয়তো চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের হয়তো একান্ত সরলীকরণ মনে হবে কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে এটা আমার ছবিগুলির পাঠ। 

আমার সব থেকে প্রিয় চারটে ছবি হলো অরণ্যের দিন রাত্রি , সীমাবদ্ধ , প্রতিদ্বন্দ্বী এবং জন অরণ্য।  এরমভাবে পশ্চিমবাংলার বাঙালি মধ্যেবিত্তর সমালোচনা কেউ করেন নি। তাঁদের ক্ষয়িষ্ণু  মূল্যবোধ , শ্রেণিগত ভণ্ডামি, নিম্নবর্গের আদিবাসী জনজাতির নারীদের প্রতি সম্ভোগের লালসা সবই কেমন যেন একটি রাজনৈতিক দৃশ্যকোন থেকে দেখেছিলাম। আর ভালো লেগেছিলো শতরঞ্জ কি খিলাড়ি। প্রেমচন্দের গল্পের যে তীব্র বিদ্রুপ এবং ক্ষোভ যে, দেশের স্বাধীনতা চলে যাচ্ছে তবু দেশের অভিজাত দুই সেনানীর অভিমান  জাগ্রত হচ্ছে না, কিন্তু দাবাতে চাতুরির অভিযোগে তাঁদের খুন গরম হয়ে উঠছে, তার যেন মূর্ত অভিবক্তি সেই ছবি। তার আগে অবশ্য নীরেন চক্রবর্তীর আউটডোর ধারবাহিকভাবে দেশে পড়ে নিয়েছিলাম। সত্যজিতের বেনারস এবং লক্ষনৌর উপর দুর্বলতা ছিল সেটা ছবিতে প্রকাশিত।
  
ত্রুফো, ফেলিনি, বার্গম্যান, কুরোসাওয়া, পোলানস্কি, বুনুয়েল নানা পরিচালকের ছবির মতো সত্যজিতের ছবির আন্তর্জাতিক দর্শক রয়েছে। কুইবেকের এক ছাত্র আমার শ্রেণিপাঠ নিয়েছিল শুধুমাত্র মহানগর ছবি দেখার জন্যে। ওই ছবির দেখার জন্যে ঢাকায় ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক ছায়াছবির প্রথম উৎসবে দর্শকরা মারপিট করেছিলেন। আমি একেবারে ভেতো বাঙালি। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী সত্যজিতের গল্প না পড়লে এবং তাঁর নির্মিত ছায়াছবি না দেখলে আমার নিজের জীবন অসম্পূর্ণ থাকতো বলে মনে করি।