বাঙালি মুসলমানের মন : কিছু কথা

শুভ বসু প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২২, ১০:৩৮ পিএম বাঙালি মুসলমানের মন : কিছু কথা

১.

বাঙালি মুসলমানের মন নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা এবং গ্রন্থ প্রকাশ ১৮৭১ সালে বাংলার প্রথম আদম শুমারি প্রকাশিত হবার পর থেকেই চলছে। তারপরে দেশ বিভাগ , বাহান্নর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ এর ২৬ সে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বহু বুদ্ধিজীবী তাদের সামূহিক মানসিকতার অনুসন্ধান করেছেন।

বাংলায় ১৮৭১ সালের আদমশুমারি হেনরি বেভারলি সাহেবের নেতৃত্বে হয়েছিল। তিনি তখন বাংলার ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ রেজিস্ট্রেশন বা নথিকরণের অধিকর্তা ছিলেন । সেই আদম শুমারি সম্পর্কে ইংল্যান্ডের Royal Statistical Society-তে ১৭ই মার্চ একটি প্রবন্ধে হেনরি বেভারলি উল্লেখ করেন যে বাংলার Lieutenant-Governor পাঁচটি প্রদেশ বাংলা প্রেসিডেন্সির অধীনে রয়েছে। এগুলি যথাক্রমে হলো বাংলা, বিহার, ওড়িশা , ছোট নাগপুর এবং অসম। এর মধ্যে হেনরি বেভারলি বলেন যে বাংলায় ২০-৫ মিলিয়ন মুসলমান রয়েছেন যাঁরা বাংলা প্রেসিডেন্সির জনসংখ্যার ১/৩ ভাগ। তবে মূল বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে তাঁদের সংখ্যা ১৭-৫ মিলিয়ন ১৮ মিলিয়ন হিন্দুর বিপরীতে। ( তথ্য সূত্র : Henry Beverly The Census of Bengal Journal of the Statistical Society of London , Mar., 1874, Vol. 37, No. 1 March 1874 p 85 )

পরবর্তীকালের আদমশুমারিতে মূল বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে আরো বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ১৮৭১ সালের আদমশুমারিতে প্রকাশিত এই তথ্য থেকেই সূচিত হয় এর কারণ খোঁজা। তবে ইংরেজ আমলা মহলে এই তথ্য সংগ্রহের পর বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। তাঁর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হেনরি বেভারলি বলেছেন যে, ভাগীরথী নদীর পূর্বদিকে বিশেষত রাজশাহী, বগুড়া, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামে তাঁরা প্রায় জনসংখ্যার তিন চতুর্থাংশ। এখানে তাঁরা মূলত কৃষিজীবী বা শ্রমিক। বেভারলি সাহেব বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছেন যে কেন বাংলায় উত্তর ভারতের তুলনায় মুসলমানের সংখ্যা বেশি। (প্রাগুক্ত :পৃষ্ঠা ৮৬)

তিনি সর্বপ্রথম অনুমান করেন যে এঁরা ছিলেন নিম্নবর্গের ভূমিদাস (Helot), তাই তাঁরা ইসলামের সাম্যের বাণী শুনে ধর্মান্তরিত হন। এটি অনুমান তৎকালীন বাংলায় গণ বুদ্ধিজীবী মহলে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র (বাঙ্গালীর উৎপত্তি) থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্য প্রান্ত পর্যন্ত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার পর্যন্ত এই তত্ত্বের প্রতিধ্বনি করেছেন। অর্থাৎ বাংলায় মুসলমান ধর্মের মানুষের অধিক সংখ্যায় উপস্থিতি এবং তাদের বাংলা ভাষা ব্যবহারের ফলে তাঁদের উৎপত্তি সম্পর্কে অনুসন্ধান এবং সেই থেকে বাঙালি মুসলমান মনের অনুসন্ধানের প্রয়াসের ঐতিহাসিক এবং সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই উৎস্য সন্ধানে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই বিশ্লেষণই ফেরত এসেছে অন্যভাবে রফিউদ্দিন আহমদের ১৯৮১ সালের লেখায় (The Bengal Muslims 1871-1906: A Quest for Identity), ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত আহমদ ছফার প্রবন্ধ 'বাঙালি মুসলমানের মন' বা অসীম রায়ের ১৯৮৪ সালের গ্রন্থ 'The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal' , Richard Eaton-এর ১৯৯৩ সালের 'The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760' বইতে।

বাংলায় মুসলমানরা শুধুমাত্র বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী তাই নয়, তাঁদের পরিচিতিবোধের নির্মাণ এবং বিনির্মাণ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯২০-২১ সালের খিলাফত আন্দোলন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২'র ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরে বাংলাদেশের মধ্যে তাঁদের জাতীয় পরিচিতি নিয়ে বির্তক। তাঁরা বাংলাদেশী না বাঙালি এই ইতিহাসকে গভীরে নিয়ে গেছে। কিন্তু এই ইতিহাসের সামূহিক পর্যালোচনার মধ্যে তিনটে সমস্যা রয়েছে। এক, এই ইতিহাস ভাষা ও ধর্মীয় পরিচিতির মধ্যে দ্বন্দ্বকে লক্ষ্য করে, দুই, এক ভাষিক এবং এক ধর্মের মানুষের মধ্যে একটি 'হোমোজেনাস এনটিটি'কে অনুমান করে তার মধ্যে শ্রেণি বিভাজন এবং তিন, লিঙ্গ বা আঞ্চলিক বিভাজনকে উপেক্ষা করে। তার ফলে এই ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় এক জাতীয়তা বোধের ইতিহাস।

 

২.

বাঙালি মুসলমানের মন নিয়ে লেখার পূর্বশর্ত হলো যাকে আহমদ ছফা খুব স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন একটি নিপীড়ত সমাজের কাহিনী। সুলতানি আমলে এবং মুঘল আমলে বাঙালি মুসলমান সমাজ সম্পর্কে শাসকরা কতখানি অবহিত ছিলেন জানা যায় না। বাংলায় অভিজাত ফার্সি এবং উর্দু ভাষী রাজপুরুষদের সম্পর্কে তাঁরা অভিহিত ছিলেন।

আধুনিক কালে ঔপনিবেশিক বাংলায় বাঙালি মুসলমান ছিলেন মূলত কৃষি সমাজের মানুষ। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ সাহেব বা নাজিমুদ্দিন সাহেব বা সোহ্‌রাওয়ার্দী এঁরা সবাই ছিলেন উর্দুভাষী মানুষ। প্রকৃতপক্ষে ফজলুল হক ছিলেন একমাত্র বাংলাভাষী মুসলমান কিন্তু তিনিও গৃহে উর্দু বলতেন বিবাহের কারণে। এমনকি ভারতের স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ মৌলানা আবুল কালাম আজাদ উর্দুভাষী ছিলেন এবং কলকাতায় তাঁর আবাসগৃহ হলেও একবর্ণ বাংলা বলতেন না।

আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলায় ঋণ জর্জরিত মুসলমান এবং দলিত কৃষক সমাজ যে জমিদার তন্ত্রের সম্মুখীন হয়েছিলেন সেই জমিদারদের অধিকাংশ ছিলেন উচ্চবর্ণের হিন্দু। ফলে নিম্ন বর্ণের হিন্দু এবং মুসলমান কৃষক সমাজ শ্রেণী শোষণের পাশাপাশি নানা ধরণের বর্ণবাদী শোষণের সম্মুখীন হয়েছেন।

আবুল মানসুর আহমদ তাঁর প্রখ্যাত আত্ম জীবনী "আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বৎসর' শুরুই করেছেন যে বাল্যকালে তাঁর বাবাকে নায়েব মশাই 'তুই' বলাতে বালক আবুল মনসুর সাহেব তাঁকে তুই বলে সম্বোধন করেন। আবুল মানসুর আহমদের বাবা যখন বলেন, বয়স্কদের সম্মান করে কথা বলতে, তখন আবুল মনসুর আহমেদ বলেন যে বাবা আপনিও বয়স্ক মুরুব্বি মানুষ, নায়েব মশাই কেন আপনাকে আপনি বলেন না। বাঙলার হিন্দু জমিদার যে অত্যাচারী ছিলেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের জাতপাত খাদ্য-অখাদ্য বিচার এবং মুসলমান এবং নমঃ শূদ্র সমাজের থেকে দূরে থাকার কারণে দেশ বিভাগের সূত্র স্থাপিত হয়েছিল। যদিও সেই হিন্দু জমিদার সমাজের থেকেই আবার মনি সিংহ এবং স্নেহাংশু আচার্য্যরা এসেছিলেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন ব্যতিক্রম।

ঊনবিংশ শতকে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য চর্চা মূলত ছিল ধর্মকেন্দ্রিক এবং কৃষিকেন্দ্রিক । সেই ধর্মীয় গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হতো কলকাতায় মেছুয়াবাজার থেকে। আর তাঁদের প্রাথমিক রাজনীতির চর্চা ছিল কৃষক চৈতন্য এবং ধর্মীয় চৈতন্যের সমাহার করে। ফলে তিতুমীরের তরিকায়ে মোহাম্মদিয়া আন্দোলন বা দুদু মিয়ার ফরাজী আন্দোলন ছিল ধর্মীয় এবং কৃষকের শ্রেণী চৈতন্যের সমাহার, তবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে নীল বিদ্রোহ, পাবনার কৃষক বিদ্রোহ প্রভৃতিতে দুই সম্প্রদায়ের কৃষকদের দেখা যায়। বিংশ শতাব্দীতে এই কৃষক চৈতন্য এবং ধর্মীয় চৈতন্যের সমাহার দেখা যায় প্রখ্যাত কৃষক নেতা মৌলানা ভাসানীর রাজনীতিতে।

রবীন্দ্রনাথ স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে নিম্নবর্গের মানুষদের উপর বাবু সমাজের রাজনীতিকে না চাপিয়ে বরং তিনি পল্লী সংগঠনের কথা বলেন। তাঁর গভীর দূরদৃষ্টির সৃষ্টি শ্রীনিকেতন। বাংলার কৃষক আন্দোলন থেকেই তৈরি হয় কৃষক প্রজা সমিতির আন্দোলন এবং শ্রমিক কৃষক দলের আন্দলন। বাঙলার শ্রেণি বিন্যাসের ছায়া কমিউনিস্ট আন্দোলনের উপরেও পরে।

বাংলার প্রথম চারজন কমিউনিস্ট হলেন মুজাফ্ফর আহমদ , আব্দুর রেজ্জাক খান , কুতুবুদ্দিন আহমদ এবং আব্দুল হালিম। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (বিবেকানন্দর ভ্রাতা) কমিউনিস্টদের সহপথগামী হলেও পার্টি সদস্য ছিলেন না, যদিও তাঁর প্রভাব কমিউনিস্টদের উপর গভীরভাবে ছিল। আর মানবেন্দ্র নাথ রায় (নরেন ভট্টাচার্য্য) কমিউনিস্ট হয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক এবং মেক্সিকোতে। তিনি অবশ্য অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে। বাঙলার প্রথম স্বঘোষিত বিপ্লবী কবি ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তবে আবুল মনসুর আহমদ বলেছিলেন, বাঙালি মুসলমান সমাজের তিনটে শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়: ব্রিটিশ শাসক , হিন্দু বর্ণবাদী শক্তি এবং রক্ষণশীল মোল্লা সম্প্রদায়ের মানুষ।

আজ প্রথম শক্তি মৃত, দ্বিতীয় শক্তির ক্ষমতা বাংলাদেশে একান্ত স্তিমিত আর পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে মানুষ বেশ সোচ্চার, যদিও বর্ণবাদের ক্ষমতা পশ্চিমবঙ্গে এখনো বিদ্যমান এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদের মধ্যে দিয়ে সোচ্চার। কিন্তু তৃতীয় শক্তি মোল্লা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কতখানি জোরালো বক্তব্য বাংলাদশে আছে, তা ক্রমশই সন্দেহের মুখে পড়ে যাচ্ছে।

( প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই ধরনের লেখা দেখে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী মানুষজন আমাকে মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রে চলে যেতে বলেন এবং কেউ বলেন যে, তিনি আমার ছাত্র হিসাবে পরিচয় দিতে লজ্জা পান। তাঁকে অনুরোধ, আমায় যত খুশি গালাগাল দিন, আমার মা কিন্তু এই পোস্ট লেখেন নি। কাজেই তাঁর স্মৃতি এর সঙ্গে না জড়ানোই ভালো।)